LightReader

Chapter 1 - অন্ধ একটি মে এবং অন্ধ একটি ছেল

Chapter 1

*ট্রেনের কামরায় দুই অন্ধ যাত্রী এবং তাদের না বলা হৃদয়ের টান নিয়ে একটি ছোটগল্প নিচে দেওয়া হলো। আমি এটি এমনভাবে সাজিয়েছি যাতে পড়তে একটি পূর্ণাঙ্গ গল্পের স্বাদ পান।

​স্টেশনের সেই সুবাস

​স্টেশনের ব্যস্ততা আর হট্টগোলের মাঝে প্ল্যাটফর্মের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল অনীক। তার হাতে একটি সাদা লাঠি, চোখে কালো চশমা। সে একা নয়, সাথে আছে তার প্রখর ঘ্রাণশক্তি আর শ্রবণশক্তি। ট্রেনের হুইসেল বাজতেই সে ধীর পায়ে কামরার দিকে এগিয়ে গেল। কামরাটা খুব একটা ভিড় নয়। জানালার ধারের একটি সিট খুঁজে নিয়ে সে ধীরেসুস্থে বসল।

​অনীক জানে না তার উল্টোদিকের সিটে কে বসে আছে। কিন্তু সে অনুভব করতে পারছিল, সেখানে কেউ একজন আছে যার শরীর থেকে বকুল ফুলের একটা হালকা স্নিগ্ধ গন্ধ আসছে।

​পরিচয়হীন আলাপ

​ট্রেন চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পর অনীক শুনতে পেল চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ। একটি মিষ্টি মেয়েলি কণ্ঠ বলে উঠল, "জানলাটা কি একটু খুলে দেওয়া যাবে? বাইরের হাওয়াটা খুব দরকার ছিল।"

​অনীক হাসল। সে জানত না জানলাটা খোলা না বন্ধ। সে হাত বাড়িয়ে আন্দাজে জানলার পাল্লাটা অনুভব করার চেষ্টা করল। মেয়েটি সেটা বুঝতে পেরে নিজেই জানলাটা খুলে দিল।

"আমি আসলে দেখতে পাই না," অনীক সরাসরি বলল।

​মেয়েটি একটু থমকে গিয়ে হাসল। "আমিও না। তাই বোধহয় আমাদের দুজনের চোখই এখন ওই জানালা দিয়ে আসা বসন্তের হাওয়াটা।"

​অনীক অবাক হলো। সে জানত না মেয়েটিও অন্ধ। মেয়েটির নাম বৃষ্টি। শুরু হলো দুজনের অদেখা পৃথিবীর গল্প।

​অনুভূতির সাত রঙ

​ট্রেন ঝমঝম করে এগিয়ে চলছে। অনীক আর বৃষ্টির কথা থামছে না। তারা কেউই একে অপরকে দেখেনি, কিন্তু একে অপরের মনের মানচিত্রটা যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।

​তাদের কথোপকথনের কিছু অংশ:

​অনীক: "রঙ কেমন হয় আমি জানি না, কিন্তু বৃষ্টির শব্দের মাঝে আমি নীল রঙ খুঁজে পাই।"

​বৃষ্টি: "আর আমি যখন মায়ের হাতের রান্না করা খাবারের গন্ধ পাই, আমার মনে হয় এটাই বোধহয় পৃথিবীর সবথেকে উজ্জ্বল রঙ।"

​তারা ট্রেনের ঝকঝক শব্দকেও সুর হিসেবে অনুভব করতে লাগল। বৃষ্টির কাছে ট্রেনের গতি মানে এক অজানা গন্তব্যের রোমাঞ্চ, আর অনীকের কাছে এটা এক পলায়ন—শহরের কোলাহল থেকে দূরে যাওয়ার।

​না বলা আবেগ

​কথা বলতে বলতে সময় কীভাবে কেটে গেল তারা টের পায়নি। কামরার অন্য যাত্রীরা আসছিল আর যাচ্ছিল, কিন্তু এই দুই অন্ধ হৃদয়ের মাঝে এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি হয়েছিল। অনীক ভাবছিল, বৃষ্টির মুখটা কেমন হবে? তার হাসিটা কি সত্যিই অতোটা সুন্দর যতটা তার কন্ঠস্বর?

​আবার বৃষ্টি ভাবছিল, অনীকের হাতটা কি খুব শক্ত? যে হাত দিয়ে সে তার সাদা লাঠিটা আঁকড়ে ধরে আছে?

​"মানুষ চোখের আলো দিয়ে যা দেখে, তা অনেক সময় মিথ্যে হয়। কিন্তু মনের চোখ দিয়ে যা অনুভব করা যায়, তা সবসময় খাঁটি।" — অনীক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

​গন্তব্য যখন কাছে

​হঠাৎ ট্রেনের গতি কমতে শুরু করল। বৃষ্টির গন্তব্য চলে এসেছে। কামরার ভেতরে লোকজনের হুড়োহুড়ি শুরু হলো। অনীকের খুব ইচ্ছে করছিল বৃষ্টির হাতটা একবার ধরতে, বলতে— "আবার কি দেখা হবে?" কিন্তু সে সাহস পেল না।

​বৃষ্টি উঠে দাঁড়াল। তার সাদা লাঠিটা মেঝের সাথে ঠকঠক শব্দ করল।

"আমার স্টেশন এসে গেছে। নামতে হবে," বৃষ্টির কণ্ঠে কিছুটা বিষণ্ণতা।

​অনীক বলল, "ভালো থেকো বৃষ্টি। তোমার বকুল ফুলের গন্ধটা এই কামরায় রয়ে যাবে।"

​বৃষ্টি একটু হাসল। "আর আপনার কথাগুলো আমার কানে। হয়তো কোনোদিন আবার কোনো ট্রেনের কামরায় আমাদের দেখা হবে।"

​শেষ বিকেলের বিষণ্ণতা

​ট্রেন ছেড়ে দিল। অনীক জানালার পাশে একা বসে রইল। তার চারপাশটা আবার আগের মতোই অন্ধকার, কিন্তু এই অন্ধকারের মাঝে এখন বৃষ্টির রেখে যাওয়া এক চিলতে বসন্তের হাওয়া খেলা করছে।

​সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা হওয়ার জন্য রূপ দেখার প্রয়োজন হয় না; শুধু দুটো সুন্দর মনের কম্পন এক হওয়া প্রয়োজন। ট্রেনের চাকার শব্দ এখন অনীকের কাছে এক দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাতে লাগল। সে শুধু ভাবল, যদি একবার সে দেখতে পেত, তবে কি বৃষ্টিকেও দেখতে পেত না কি তার মনটাকেই বেশি ভালোবাসত?

​উপসংহার:

ট্রেনটি স্টেশনের পর স্টেশন পার হয়ে যাচ্ছিল, আর অনীক তার স্মৃতির পাতায় বৃষ্টির সাথে কাটানো সেই সাত পৃষ্ঠার এক রঙিন গল্প লিখে রাখছিল। যে গল্পে কোনো বর্ণমালা নেই, আছে শুধু অনুভূতির গভীরতা।

More Chapters